Homeরাজনীতিশেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তায় বিস্ফোরক মন্তব্য নাহিদ ইসলামের

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তায় বিস্ফোরক মন্তব্য নাহিদ ইসলামের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্যই দেশে ফিরবেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

শুক্রবার (১০ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা উদ্যোগ (এমএসএমই) দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ন্যাশনাল এসএমই অ্যাসোসিয়েশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে একটা ইন্টারভিউ আমরা দেখেছি, ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন। তো আমাদের দাবি থাকবে যে, দেশ তো অলরেডি ১৬ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরাও চাই দেশে ফিরবে, ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে রায় হয়ে গিয়েছে। এখন এই সরকারের উচিত যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় গণহত্যাকারীকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা কিভাবে আসবেন, তিনি কাদেরকে নিয়ে আসবেন, তিনি সারেন্ডার করবেন কি করবেন না-এটা ঠিক করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে দিল্লির সঙ্গে কথা বলবে। এখানে আর কোনো পক্ষ নাই। ফলে সরকারই ঠিক করবে তাকে কখন আনবে, কিভাবে আনবে এবং কিভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে। সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে আনতে হবে।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন,  শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। দিল্লি থেকে তাকে যতটুকু পারমিট করা হয়, সে অনুযায়ী সে কথা বলে। ফলে শেখ হাসিনা আসবেন কি আসবেন না, কিভাবে আসবেন, বিচার হবে কিনা?এসব মূলত দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ তো এখন কোনো রাজনৈতিক দলই নয়।

জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যারা অংশগ্রহণ করেছেন, রাজনৈতিকভাবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুত আছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছি।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার যদি কোনো ধরনের পাঁয়তারা বা প্রচেষ্টা হয়, সরকার যদি সেটাকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন সরকারই হবে। বাংলাদেশের আপামর জনগণ, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ, ত্রিশ হাজার আহত ও ১ হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্য, আমরা সবাই প্রস্তুত আছি।

গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগকে দলগতভাবে বিচারের আওতায় নেওয়ার কথা সরকারও ভাবছে। আমরা মনে করি, এটাই সঠিক রাস্তা। শেখ হাসিনার রায় অলরেডি হয়ে গিয়েছে। এখন এটা কার্যকর করতে হবে। শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, কেবলমাত্র ফিরবেন ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। ফলে সেটার জন্য আমরাও চাই যে, ফাঁসির রায় কার্যকর হোক।

অনুষ্ঠানে সারাদেশ থেকে আসা বিভিন্ন উদ্যোক্তা অংশ নেন। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তারা বক্তব্য দেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের পলাতক নেতা-কর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটি জানিয়েছেন তিনি। এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লিখিতভাবে প্রশ্নের উত্তর দিলেও সরাসরি কথা বলেননি শেখ হাসিনা। রয়টার্স বলছে, টেলিফোনে তার এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি এবং তার দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা দুই বছর আগে বাংলাদেশে থেকে পালিয়ে এসেছিলেন, সেখানে স্বেচ্ছায় ফিরে তিনি আদালতে হাজিরা দেয়ার কথা ভাবছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মাধ্যমে ঢাকা শেখ হাসিনার প্রতি কেমন আচরণ করবে, তা একটি পরীক্ষার মুখে পড়বে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তবুও আমাকে যেতে হবে। আমার দলের নেতা ও কর্মীরা প্রচণ্ড দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যু আসে, আমি চাই তা আমার নিজের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত এবং যেখানে তাদের রক্ত ​​ঝরেছে।’

রয়টার্স বলছে, একাধিক মেয়াদে ২০ বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসান ঘটিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালে হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণঘাতী দমনপীড়নের নির্দেশ দেয়ায় দেশটির মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গেল বছরের নভেম্বরে তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে, তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই বছরের অস্থিরতার পর বর্তমান সরকার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ফিরে আসলে পোশাক রপ্তানিকারক এই শক্তিশালী দেশটিতে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার ফেরা ভারতের সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক কাটিয়ে উঠতে ভূমিকা রাখতে পারে, যা নয়াদিল্লি তাকে আশ্রয় দেয়ার পর তীব্রভাবে খারাপ হয়েছিল।

বাংলাদেশ তাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে বারবার অনুরোধ করেছে। তবে এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে তিনি ফিরবেন কি না, বা কখন ফিরবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা দেননি। এই প্রথম তিনি তার প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি সময়সূচি ঘোষণা করেছেন, আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা বলেছেন এবং অন্য আওয়ামী লীগ নেতারাও তা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে দলটির নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। রয়টার্স দলের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে বা তারা কোথায় আছেন তা নিশ্চিত করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঢাকার কর্তৃপক্ষ আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।’ হাসিনার মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্টরা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি বলে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে গত এপ্রিলে ভারতের এই মন্ত্রণালয় জানায়, তারা হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে এবং তারা নতুন সরকারের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দমনপীড়নের ফলে তার পতন ঘটে, তাতে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন। হাসিনা দিল্লিতে তার অবস্থান থেকে রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপন করে আছেন। তাই আমি বলেছি যে এবার আমি দেশে ফিরছি এবং একদিন আপনারা সবাই আসবেন। আমরা সবাই মিলে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’

তবে, তিনি তার ফেরার কোনো তারিখ জানাতে বা ঠিক কখন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, তা বলতে রাজি হননি। রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি এবং আমি মনে করি যে একবার কার্যক্রম শুরু হলে, আদালত কতটা প্রহসনমূলক তা জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং আমি তা প্রমাণ করতে চাই। জনগণই সিদ্ধান্ত নিক।’

দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানান শেখ হাসিনা। তবে তিনি জানান, কারাবাস নিয়ে তিনি চিন্তিত নন, কারণ এর আগেও তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’

সাক্ষাৎকারে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কারণও জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, পালিয়ে যাওয়ার কারণ হলো তার বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসা জনতার ওপর প্রাণনাশের হুমকি। একটি সরকার যখন দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুল হতেই পারে, কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিচার করার অধিকার জনগণের। তিনি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন।

তার পালিয়ে যাওয়ার পর তার দল আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা হয়তো আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগকে কেন স্থগিত করবে? আমরা যদি ভুল করে থাকি, তবে জনগণই তার সিদ্ধান্ত নিক।’

- Advertisment -spot_img

সর্বশেষ খবর